বাল্যবিবাহ পর্ব-১; কুড়িগ্রামের দ্বীপচরে প্রাথমিকেই বাল্যবিয়ে, এই গন্ডি পেরুলেই আর হয় না বিয়ে
বাল্যবিবাহ পর্ব-১; কুড়িগ্রামের দ্বীপচরে প্রাথমিকেই বাল্যবিয়ে, এই গন্ডি পেরুলেই আর হয় না বিয়ে
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
চরাঞ্চল অধ্যুষিত কুড়িগ্রাম জেলার দুধকুমার নদ ও ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যবর্তী দ্বীপচর। চরের গ্রামগুলোতে পৌঁছানোর একমাত্র বাহন নৌযান। নৌকা থেকে নেমে জমির আইল ধরে হেঁটে গ্রামের ভেতরের মেঠো পথের দেখা মিলবে। নদীর পানি প্রবেশ করে পথগুলোর স্থানে স্থানে নিমজ্জিত। এক দিক থেকে আরেক দিক যেতে হলে পরণের পোশাক ভিজতে বাধ্য। অনেক গ্রামের মতো এখানেও একটি মাত্র স্কুল, সেটিও সরকারি নয়। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোলেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় মেয়ে শিশুদের।
এটি গ্রামটির ‘নিয়ম’, মেয়েদের ‘অপরিহার্য পরিণতি’। রঙিন স্বপ্ন চোখে নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুদের সেই ‘ নিয়মের’ কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়। স্কুলটির এক শিক্ষক আক্ষেপ করে জানালেন, ‘এখানে বিয়ে মানেই বাল্যবিয়ে। অন্তত ৯০ ভাগ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার। এটা চরের বাস্তবতা। এমন বাচ্চা মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় যে দেখলে চোখ দিয়ে পানি চলে আসে।’ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, গ্রামটিতে ১৮ বছর পার করে মেয়েদের বিয়ে হওয়ার ঘটনা বিরল। হলেও ‘খুঁতযুক্ত’ কিংবা দ্বিতীয় বিয়ে করা বর পেতে হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে বিয়ের বয়স ১৮ কিংবা ২০। কখনও এর নিচেও মাথায় মুকুট ওঠে। বাল্যবিয়ে এখানে ‘স্বাভাবিক’, চিরাচরিত ‘নিয়ম’।
তাদের ভাষায়, ‘বিয়ে হইলে সবাই খুশি।’ গ্রামটির একটি বাড়ির সামনে মেঠো পথের ধারে পুঁতে রাখা বাঁশের মাথায় নিজ স্কুল ব্যাগ রোদে শুকাতে দিচ্ছিল এক কিশোরী। কিশোরী না বলে তাকে শিশু বলাটাই যুৎসই হবে। পরণে লাল টুকটুকে জামা। মুখে শিশুসুলভ কোমলতা। বয়স ১৩ এর সামান্য বেশি। স্থানীয় একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। রোল- এক। কথা বলে জানা গেলো, দেড় মাস আগে তার বিয়ে হয়েছে। বর আত্মীয়, পেশায় নির্মাণশ্রমিক। কিশোরীর বাড়ির আঙিনায় দেখা মিললো তার মা ও নানির সঙ্গে। গল্পে গল্পে জানা হলো কিশোরীর বিয়ের কারণ ও বাস্তবতা।
কিশোরী জানায়, সে বিয়ের জন্য কোনোভাবে রাজি ছিল না। বাল্যবিয়ের ক্ষতির দিক সে জানে। কিন্তু চরে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। সেখানে এটা ‘নিয়ম’। বয়স বেশি হলে বিয়ে হতে চায় না, কনের ‘কদর’ থাকে না। তাই সব পরিবার মেয়েদের বয়স কম থাকতেই বিয়ে দেয়। কিশোরী বলে, ‘জানেন, আমার রোল এক। ফাইভ (পঞ্চম শ্রেণি) থেকে ক্লাসে এক রোল করি। আমার স্বপ্ন পড়াশোনা করবো, অনেক দূর পড়বো। পড়তে ভালো লাগে। আমি বিয়ে করতে চাই নাই, প্রস্তুত ছিলাম না। পরিবারের চাওয়ায় বিয়ে হইছে।’
তুমি তো স্কুলে পড়ো, বাল্যবিয়ের ক্ষতি জানো না, এমন প্রশ্নে এই কিশোরী ‘বধূ’ বলে, ‘জানি, শরীর ও মনের ওপর চাপ পড়ে। গর্ভধারণের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু চরে অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াটা নিয়ম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকতে আমার দুই বান্ধবিরও বিয়ে হয়ে গেছে। তারা এখন আর স্কুলে আসে না। কিন্তু আমি এখনও স্কুলে যাই। পড়াশোনাটা করতে চাই।’ বিয়েতে রাজি হওয়ার প্রশ্ন করতেই পাশে থাকা কিশোরীর নানি বলেন, ‘ওই কী কইবে! বাড়ির লোকজন বিয়ার ব্যবস্থা করছে। চরত কম বয়সে বিয়া দেওয়ার নিয়ম। ১৮ বছর বয়সে বিয়া হওয়া পাবার নন। গতিকে একটা দুইটা হইলে হয়। বর পক্ষ খুব করি ধরছে। এই জন্যে বিয়া দিছি।’ কিশোরীর মা বলেন, ‘ওর বাবার সাথে তালাক হইছে। মেয়েকে নিয়া ভাইয়ের সংসারে থাকি। মেয়ের বিয়ার জন্য খুব করি ধরছে। বিয়া না দিলে কিছুতে ছাড়ে না।’ এই মায়ের ভাষ্য, ‘চরের নিয়ম অল্প বয়সে বিয়া দেওয়া। বয়স বাড়লে মানুষ নানা কথা কয়।’ দুধকুমার-ব্রহ্মপুত্র কিংবা ধরলা-তিস্তা, কুড়িগ্রাম জেলার চরাঞ্চলে বাল্যবিয়ে সাধারণ ঘটনা। যেন চিরাচরিত সমাজিক চর্চা।
উপযুক্ত বয়স তাদের কাছে ‘বেশি’। স্কুল ও কর্মসংস্থান না থাকা, অনিশ্চিত ভবিষ্যত, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, সর্বোপরি চরের ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থা বাল্যবিয়ের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। গ্রামটির বাসিন্দা মোঃ সাইফুর রহমান বলেন, ‘মেয়েক বাড়িত রাখি কী করবে। এটাই একটা স্কুল। কলেজ নাই। রাস্তাঘাটও নাই যে ওপারে পাঠে দিয়া কলেজ পড়ামো। মেয়ে মাইনষক নৌকাত করি ওপারে পাঠে দেওয়ার ভরসা পাই না। কার ভরসায় পাঠে দিমো। বাড়িত থাকি কী করবে। এজন্যে সবাই বিয়া দিয়া দেয়।’ অল্প বয়সে বিয়ে ও যৌতুক প্রশ্নে সাইফুর বলেন, ‘কম বয়সের মেয়ে বিয়া করার চাহিদা বেশি। পুরুষের বিয়াও ওই অল্প বয়সে হয়। বড় জোর ১৮-২০ বছর। আর যৌতুক দেওয়ায় লাগবে। ৬০ হাজার থাকি শুরু, দেড় দুই লাখও দেওয়া লাগে।
মেয়ের বয়স আর ছেলের কর্মের ওপরা যৌতুক কমবেশি হয়।’ গ্রামটির এই বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা গেলো, আগের দিন এক কিশোরীর বিয়ে হয়েছে। বয়স সতেরোর সামান্য বেশি। সেটি তার চতুর্থ বিয়ে। এর আগে তিনবার বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে মেয়েটি। সংসার টেকেনি।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স